আমাদের মাদ্রাসা
প্রাককথন:
‘শিক্ষা’ মানবজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়। জ্ঞানকে আল্লাহ তায়ালা আলোর সাথে তুলনা করেছেন। সকালের সূর্যের আলো যেমনিভাবে রাতের অন্ধকার দূর করে দেয়, জ্ঞানও তেমনিভাবে মানুষের ভিতর থেকে সকল প্রকার কলুষতা, বর্বরতা, অমানবিকতা, জাহেলিয়াত প্রভৃতি মানবতা বিরোধী পশুত্ব দূর করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার। সেজন্য পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা জ্ঞানীদের মর্যাদা স্পষ্ট করে দিয়ে ইরশাদ করেন -” (হে রাসূল) আপনি বলুন, যারা জানে আর যারা জানেনা তারা কি সমান?” (সুরা যুমার, ৩৯:০৯)
পৃথিবীব্যাপী আজ নৈতিকতার চরম পদস্খলন দিনের আলোর মত পরিষ্কার। একজন মানুষের মধ্যে নৈতিকতা না থাকলে তাকে মানুষ বলা যায় না। নৈতিকতাহীন মানুষের আচরণ আর পশুর আচরণের মাঝে পার্থক্য থাকে না। ইসলামের জ্ঞান যার মধ্যে প্রবেশ করেছে সে-ই হয়েছে পরশ পাথর। এভাবে জাহিলিযুগের মানুষগুলোর মাঝে যখন ইসলামের সুমহান শিক্ষার বাস্তবায়ন ঘটেছিল তখনই তারা হয়ে উঠেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ।
ইসলামের এসব আদর্শের মূল ভাণ্ডার হলো ইলমে ওহি তথা কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান। ওহির এই শিক্ষার সাথে যারা জড়িত তাঁরাই পৃথিবীতে উত্তম আদর্শের অধিকারী। মহানবী সা. ইরশাদ করেন – “তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে কুরআন শিখে এবং অন্যকে শেখায়। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫০২৭)।
ইসলামের স্বর্ণালী যুগের শিক্ষাব্যবস্থা ও সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রেক্ষাপট:
এ বিষয়ে প্রনিধানযোগ্য যে, ইসলামের স্বর্ণালী যুগের শিক্ষাব্যবস্থায় কোন বিভাজন ছিল না। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় তৈরি হয়েছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ ইসলামিক স্কলারগন। যেমন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে ইবনে সিনা র., আল বিরুনী র., হাসান ইবনে হাইসাম র., আলী ইবনে রাব্বান র.; ফলিত প্রকৌশলের অগ্রদুত আল-ফারগানী র., রসায়ন তথা আল কেমিস্ট, জ্যোতির্বিজ্ঞান, প্রকৌশল এবং দার্শনিক হিসাবে জাবের ইবনে হাইয়্যান র.; দার্শনিক ও আধ্যাত্নিক হিসাবে ইমাম গাজালী র. ও ইবনে আরাবী র.; আল জেবরা তথা বীজগণিতে মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খাওয়ারিজমী র. প্রমুখ মুসলিম মণীষীগণ। যারা একাধারে ছিলেন বিজ্ঞ আলেম এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বিশ্ববরেণ্য। আর সেই শিক্ষা ব্যবস্থাটাই ছিল সমাজ ও রাষ্ট্রের সমাদৃত সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা। কিন্তু ইসলামী খিলাফত ও রাষ্ট্রব্যবস্থা ধ্বংসের পরে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে তৈরি করা হয় পরিকল্পিত বিভাজন।
ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষাব্যবস্থায় বিভাজনের প্রেক্ষাপট:
১৭৫৭ সালে সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ বেনিয়া কর্তৃক ভারতীয় উপমহাদেশ দখলের পরেই জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখা সমৃদ্ধ একমুখী ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে শুরু হয় পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। ১৮৩৫ সালে স্যার ম্যাকলে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা থেকে প্রায় ৩ লক্ষ মাদরাসা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়ে ধর্মীয় শিক্ষাকে অপসারনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থায় যে বিভাজন রেখা টানেন তারই ক্ষত আজো বয়ে বেড়াচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা।
বিভাজিত ধর্মহীন শিক্ষাব্যবস্থার কুফল:
শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। সাম্রাজ্যবাদী বৃটিশ বেনিয়া কর্তৃক প্রণীত শিক্ষাব্যবস্থা এক শতকের মাথায় জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নত আদর্শ মুসলিম জাতিকে জ্ঞানশূন্য কর্মবিমুখ এক মেরুদণ্ডহীন জাতিতে পরিণত করে। বৃটিশরা মুসলিমদের এই মেরুদণ্ড সম্পূর্ণরুপে ভেঙ্গে দেয়। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি হয় সম্পূর্ণ সেক্যুলার তথা ধর্মহীন শিক্ষা ব্যবস্থা। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় মুসলিমরাও তাদের নিজ ধর্ম ইসলামের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ তারা জন্মগত মুসলিম হলেও শিক্ষাগতভাবে অমুসলিম মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠছে (By Born Muslim, By product anti-islamist)।
অপরদিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতাহীন দ্বীনি শিক্ষা ব্যবস্থা রূপ নিয়েছে জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞানশূন্য কর্মবিমুখ শিক্ষা ব্যবস্থায়। যা মুসলিম সমাজে দ্বীনি (ইসলামী) ও দুনিয়াবী (আধুনিক) শিক্ষার নামে জ্ঞানের দুটি আলাদা ধারা তৈরীর কুফল। আমরা দ্বীনি ও দুনিয়াবী শিক্ষাকে আলাদাজ্ঞান করি না। কারণ আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে বলেছেন – “নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলার নিকট দ্বীন তথা একমাত্র জীবনব্যবস্থা হচ্ছে ইসলাম।’
সুতরাং দ্বীন তথা ইসলামই হবে একজন মুমিনের কাছে “Complete code of life ” আর দুনিয়া হবে “The field in where (the complete code of life) are being applied”
সেমতে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থাটাই হচ্ছে একটি সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা। আধুনিক যুগে জ্ঞানের অগ্রগতি যত দ্রুতই হোক না কেন, তা যদি নৈতিকতা ও ঈমানের আলোতে আলোকিত না হয়, তবে সে জ্ঞান মানবতার উপকারের পরিবর্তে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। জ্ঞানই মানব জীবনের প্রকৃত আলো। আর এই আলো তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা যুক্ত হয় সঠিক নৈতিকতা, আদর্শ ও আল্লাহভীতির সঙ্গে। বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থার চমকপ্রদ অগ্রগতি সত্ত্বেও নৈতিক অবক্ষয় ও আত্মিক শূন্যতা ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই আমাদের উদ্যোগ “মাদরাসাতু ইত্তিহাদিল উলুম ঢাকা”, যা নৈতিক তথা ইসলামী ও সাধারণ শিক্ষার এক সমন্বিত বাতিঘর।
আমাদের লক্ষ্য:
- শিক্ষার সকল স্তরে বৈষম্য দূরীকরণ এবং দ্বীনি ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে দক্ষ, যোগ্য ও তাকওয়াবান জাতি গঠন করা।
- এই সুশিক্ষিত মানব সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নয়ন সাধন।
- বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে আদর্শ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা।
- সর্বোপরি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ স. এর পদাঙ্ক অনুসরণের মাধ্যমে মহান রব্বুল আলামিন এর সন্তুষ্টি অর্জন।
আমাদের উদ্দেশ্য:
- ঘুনে ধরা ও বহুধা বিভক্ত শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে দুনিয়ায় শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথে অগ্রসর হওয়া।
- এমন একটি শিক্ষায়তন গড়ে তোলা যেখানে শিক্ষার্থীরা সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে এবং এমনভাবে শিক্ষা লাভ করবে যেন তাঁরা ঐহিক, পারলৌকিক, প্রাকৃতিক এবং সামাজিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার, বিচার, গ্রহণ ও বর্জন করার ক্ষমতা অর্জন ক‡র।
- এমন ধরনের শিক্ষক তৈরী করা যারা সাহিত্য, শিল্পকলা, সমাজ বিজ্ঞান, বিজ্ঞান এবং অন্যান্য জ্ঞান বিজ্ঞানকে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আয়ত্ত করার এবং শিক্ষার্থীদের সেই দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষাদান করার পদ্ধতি অর্জন করবেন।
- শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের এই নতুন জ্ঞান অর্জন পদ্ধতি আয়ত্ত করার জন্য এমন একটি গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা, যেখানে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ভিত্তিমূলে চলমান ধর্ম-বিরোধী ভাবধারার স্থলে ইসলামি ভাব মর্যাদা প্রতিষ্ঠার কাজ আঞ্জাম দিবে এবং সেই ভাবধারার ভিত্তিতে শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক এবং পাঠসংক্রান্ত অন্যান্য যাবতীয় বস্তু তৈরি করার পূর্ণ ব্যবস্থা করবে।
- এ জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে মানুষকে সে পথে পরিচালিত করা, যে পথ অনুসরণ করে মানুষ আল্লাহ তায়ালার খলিফা হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে।
- আধুনিক বিশ্বের সকল প্রযুক্তির উন্নয়ন ও নৈতিক অধঃপতনকে সামনে রেখে জ্ঞানের মূল উৎস কুরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক কর্মমূখী আধুনিক কারিকুলাম, সরকারি নীতিমালা অনুসরণ ও নিবিড় তত্ত্বাবধানের সমন্বয়ে দৈহিক, মানসিক, বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও আদর্শিক গুণাবলী সৃষ্টির মাধ্যমে মানবিক ও নৈতিক মূলবোধ সম্পন্ন দক্ষ মানবশক্তি তৈরি।